গত ১লা মে ২০২৩ তারিখে ঢাকা থেকে আমি আর বাবু ভাই ঢাকা থেকে চট্বগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেই। বাস থেকে নামতে নামতে সকাল সাড়ে ছয়টা বেজে যায়, রাস্তায় বেশ কন্টেইনারের ভীড় ছিলো বলে বাস তেমন টানতে পারেনি। এরপরে আমরা সোজা সিএনজিতে করে অনন্যা চলে যাই যেখানে রাস্তার পাশেই বেশ বড় এলাকাজুড়ে ঘাসবন রয়েছে। তার মধ্যে বিরল হলদে-পেট প্রিনিয়া পাওয়া যায়। আমরা সিএনজি থেকে নেমে দ্রুত একটা ঝুপড়ি হোটেলে নাস্তা সেরে কাজে নেমে পড়ি। চট্বগ্রামের পরিচিত বার্ডারভাইদের কজন রাজশাহী গেছেন, অন্যরা ব্যস্ত ফলে আমাদেরকে নিজে নিজেই ঘুরতে হবে। তবে সায়েদ আবদু ভাইয়ের থেকে ভালোভাবে তথ্য নিয়ে এসেছি, এজন্য তাকে অনেক ধন্যবাদ। উনি তখন হয়তো পদ্মার বুকে গা ডুবিয়ে ছোট পানচিল তোলায় ব্যস্ত।
আমরা অনন্যায় প্লটের মাঝখানের রাস্তাগুলো ধরে ধরে হাটছিলাম আর প্রিনিয়াদের কার্যকলাপ খেয়াল করছিলাম। যায়গাটায় প্রচুর নিরল প্রিনিয়া আমাদের চোখে পড়েছিলো। বেশ কিছুক্ষন ইতিউতি হাটাহাটির পর হঠাত মুখস্থ করে যাওয়া হলদে-পেট প্রিনিয়ার ডাক ও কাছেই এক ঝোপে নড়াচড়া লক্ষ্য করি। বাইনোকুলার লাগিয়ে তাকাতেই মুখে হাসি ফুটে ওঠে যে পাখি পাওয়া গেছে। এরপরে বেশ অনেক সময় ধরে আমরা বেশ কয়েকটি প্রিনিয়ার ছবি তুলি আর ডাক রেকর্ড করি। আমাদের দুইজনের জন্যই পাখিটি নতুন। এই ঘাসবনে লালচে-টুপি ছাতারেও পাওয়া যায়, সম্প্রতি দেখাও গেছে। ডাক বাজিয়ে বাজিয়ে বেশ ঘুরাঘুরির পরেও এই ছাতারের দেখা পেলাম না। বাবু ভাইয়ের তোলা আছে আগে, আমার জন্য নতুন হত। ছাতারেটাকে না পেলেও আমরা ছোত কানাকুয়ার দেখা পেলাম, সে খুব কাছ থেকে একেবারে ফাঁকা ডালে বসে আমাদের সামনে দারুন ছবি তোলার সুযোগ করে দিলো। ডাকও রেকর্ড করলাম কাছ থেকে। এই পাখিটি আমাদের দুইজনেরই আগে থাকলেও এই প্রথম পুরুষ পাখির এত কাছ থেকে এত সুন্দর ছবি নিতে পারলাম। আমার মনেহয়না বাংলাদেশে এই পাখির এরকম ছবি আর কারও আছে।
এরপরে আমরা অনন্যার পাট চুকিয়ে সাড়ে নয়টার দিকে আবার অক্সিজেন মোড়ে ফেরত আসি আর ফটিকছড়ির বাস ধরি, ঘন্টা দেড়েকের পথ লোকাল বাসে। দুজনেই একটু ঘুমিয়ে নেই কারন রাতে বাসে ভালো ঘুম হয়নি। ঝরঝরে শরীরে ফটিকছড়ি নেমে দুপুরের জন্য নাস্তা-ফল কিনে ব্যাগে ভরে হাজারিখিলের উদ্দেশ্যে সিএনজি রিজার্ভ করে রওনা দেই। সেখানে পৌছে টিকিট কেটে এবং নিজেদের তথ্য ও ফোন নাম্বার কাউন্টারে জমা করে বনের ভেতর হাটা শুরু করলাম। প্রথমেই অন্ধকার ট্রেইলে যাই, খাসিয়া পল্লীর আগ পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরে আসি কারন পাখির নড়াচড়া বেশী ছিলোনা। তার উপর রোদ চড়ে গেছে, সময় প্রায় বারোটা। ফিরতি পথে কালো-ঘাড় রাজনের বাচ্চা সহ বাসা দেখি, একযায়গায় খুব ভালোভাবে কালো-গলা টুনটুনির ডাক শুনতে পাই। আমার আগে দেখা আছে তবে ছবি বা ডাক রেকর্ড নেই তাই আমি ছবি বাদ দিয়ে আগে ভালোভাবে ডাক রেকর্ড করি। পাখিটা এরপরে ছবি তোলার সুযোগ না দিয়েই পালিয়ে গেল, ছবি তোলা হলোনা। আরেকটু ফিরে অন্ধকার মত যায়গায় ট্রেইলের পাশের ছড়ায় শুকনো মাটিতে একজোড়া ছাতারে দেখি, বাইনোকুলারে ভালো করে দেখেই এক্সাইটেড হয়ে বাবুভাইকে জানাই যে এগুলো বিরল হলদেটে-বুক ছাতারে, যা আমাদের দুজনের জন্যই নতুন। বেশ কয়েকবার পাখিদুটো ফিরে ফিরে আসে তবে বেতঝোপের ভেতর অন্ধকারে হওয়ায় ভালো ছবি তুলতে পারিনি আমি, বাবু ভাই ভালো ছবি পান। এরপরে সিড়ি বেয়ে টিলায় উঠে নাস্তা করে নেই এবং বিশ্রাম নেই। জাবি প্রাণীবিদ্যার একটি জুনিয়র ছাত্রের সাথে দেখা হয় তখন, তার বাড়ি পাশেই হাটোহাজারিতে, সে হাজারিখিলের প্রাণীদের নিয়ে একটি গবেষনার উপাত্ত সংগ্রহ করতে এসেছে।
এরপরে আমরা সিদ্ধান্ত নেই যে আমরা ছড়ার ট্রেইলে ঢুকবো, সেখানে নাকি কাঠময়ুর পাওয়া যায়। ট্রেইল ধরে আমরা আগাতে থাকি কিন্তু শুক্রবার হওয়ায় প্রচুর লোকজনের চলাচল খেয়াল করি, অনেক টুরিস্ট ব্লুটুথ স্পীকারে উচ্চস্বরে গান বাজাচ্ছিলেন। ছড়ার অল্প পানিমত একটা যায়গায় বিকেল নামার সাথে সাথে বুলবুলিদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। সেখানে আমরা বেশ কিছু সময় ব্যয় করি এবং ছবি তুলি। এরমধ্যে দেখি চট্বগ্রাম বার্ড ক্লাবের বড়ভাই আহসান উদ্দীন চৌধুরী তার এক কাজিনকে নিয়ে বেড়াতে এসেছেন। উনার পরামর্শ মত একযায়গায় লেবুগাছের মধ্যে বসে ছড়ায় চোখ রাখি। শেতাক্ষী, নেপাল ফালভেটা, ৪-৫ রকমের বুলবুলের ছবি পাই পানি খেতে আসার সময়। এরমধ্যে একফাকে আমি আর বাবুভাই দুজনেই লেবুগাছে একটি কালো-গলা টুনটুনি স্ত্রী পাখির ছবি তুলতে পারি কাছ থেকে। আমার জন্য নতুন ছবি, বাবু ভাইয়ের জন্য বেটার ছবি। এছাড়া পানি এসেছিলো চাকদোয়েল। কাঠময়ুরের ডাকও শুনিনি আমরা সেদিন একবারও, তাই সন্ধ্যার আগে আগে পাহাড়ি ট্রেইলে একটু ঢুকি কারন মুখেই নাকি মাঝেমধ্যে লাল-মাথা কুচকুচি পাওয়া যায় মাঝেমধ্যে। কিছুক্ষন অপেক্ষা করেও কোন হদিস পাওয়া গেলোনা, তবে একটি সবুজ তাউরা বেশ ডাকাডাকি করছিলো। অন্ধকার হয়ে আসার আমরা দুজন ফিরতি পথ ধরি, চা বাগানে একটু ঢু মারি। সেখানে লাল-ঘাড় পেঙ্গা দেখি, এবং একজোড়া বাংলা কুবোর ডাক ও দেখা আবার পাই এখানেও, বাহ। ঝোপের মধ্য থেকে লাফিয়ে একটি ক্রেক জাতীয় পাখি আবার ঝোপে ঢুকে যেতে দেখি কিন্তু কি ছিলো বুঝতে পারিনি, ডাহুক টাহুক নয় মোটেও।
জোরকদম হেটে আমরা হাজারিখিল বাজার পর্যন্ত চলে আসলাম। মন বেশ ফুরফুরে ছিলো, কারন আমার তিনটি ও বাবু ভাইয়ের দুটি লাইফার হয়েছে। প্রায় দুমাস ধরে আমার লাইফারের ক্ষরা চলছিলো , তা কাটলো অবশেষে। চা খেয়ে শহরের উদ্দেশ্যে সিএনজিতে উঠে বসলাম এবং যেয়ে প্রথম সুবিধাজনক বাসে চেপে ঢাকার পথ ধরলাম।
আমার তিনটি ছবির লাইফার হচ্ছেঃ হলদে-পেট প্রিনিয়া, হলদেটে-পেট ছাতারে আর কালচে-গলা টুনটুনি। সময় নিয়ে পড়ার জন্য ধন্যবাদ।



